#অ্যাথানাসিয়া পর্ব ০২


পর্ব ০২

- রাত ৩ প্রহর
- ফ্যাবভিয়ার ক্যাসল
রাত তিন প্রহরের সময়।অ্যাথানাসিয়া হেঁটে হেঁটে জর্জিওসের কামরার সামনে উপস্থিত হয়, তার সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে।
জর্জিওসের কামরার সামনে দাঁড়ানো প্রহরী অ্যাথানাসিয়ার পথ আটকে দেয়, বাঁধা দেয় কামরায় প্রবেশে।
অ্যাথানাসিয়া, কঠিন শব্দে প্রহরীকে বলে,
"কি হলো প্রহরী, হঠাৎ আমায় আটকালেন কেনো? আমি তো আপনাদের নতুন মহারাজের দর্শনে এসেছিলাম, তার সাথে সাক্ষাৎকারের জন্য।"
প্রহরী কিছুটা ইতস্তার সাথে জবাব দেয়,
"মাফ করবেন, প্রিন্সেস, এই মুহূর্তে কামরায় কাউকে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন নতুন মহারাজা।"
অ্যাথানাসিয়া কিছুটা শান্ত কন্ঠে,
"কেনো??"
"উনি এখন গোসলে আছেন, তাই।"
অ্যাথানাসিয়া আর কোনো কথা বাড়ায় না, মনস্থির করে, আগামীকাল সন্ধ্যায় দেখা করবে।
সেখান থেকে দ্রুত প্রস্থান করে অ্যাথানাসিয়া। নিজের কামরায় এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, নেত্রপল্লব বুঝে নেয়, কিছু সময়ের মাঝে নিদ্রায় সাহিত হয়।
আজ অনেকটা ক্লান্ত থাকায় খুব দ্রুত চোখে ঘুম এসে যায় অ্যাথানাসিয়ার।
- এদিকে ডোরাথোস তার প্রথম স্ত্রী এফিমিয়া-র কাছে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে বক্তব্য জানতে চান,
এফিমিয়া উত্তর দেন, "মহারাজ, আপনার সিদ্ধান্ত সবসময় মঙ্গলজনক, আমার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আপনার সিদ্ধান্ত আমাদের সবার কাছেই মহামূল্যবান। জর্জিওসের মাঝে আপনি হয়তো এমন কিছু দেখতে পেয়েছেন যা আমাদের অন্য কোনো পুত্রদের মাঝে নেই।"
স্ত্রীর কথায়, মন ভরে উঠে ডোরাথোসের। যদিও সে জানতো, এফিমিয়া কখনোই তার সিদ্ধান্তে বাধাগ্রস্ত করেন না, তার অটুট বিশ্বাস রয়েছে স্ত্রীর ওপর।
---
- সকাল ১০ প্রহর
- ফ্যাবভিয়ার ক্যাসল
অ্যাথানাসিয়া, আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়।
হালকা টিপটিপ করে চোখদুটো খুলে নেয়, হাই তুলতে তুলতে বিছানা ছেড়ে উঠে, পর্দাগুলো সড়িয়ে দেয়।
সাথে সাথে সূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়ে ঘরের চারদিকে। আলোয় আলোকিত হয়ে উঠে পুরো কামরা।
অ্যাথানাসিয়া জোরে একটা শ্বাস টানে।
বাতাসের সাথে মৃদু মৃদু গন্ধ এসে নাকে বারি খায়— হ্যাঁ! বাগানে ফুটে থাকা গোলাপ আর নার্গিস ফুলের সুবাস।
অ্যাথানাসিয়া পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন হয়ে সাদা রঙের হাঁটু অবধি গাউন পরে, সাথে বড় লম্বা কালো বুট।
বরাবরের মতোই খোলা চুল, থুতনির মাঝ বরাবর গাঢ় বাদামী একটা তিল— যেটাকে তার সৌন্দর্যের প্রতীক ধরা হয়।
সে আজ বন্ধুদের সাথে একসাথে নাশতা করবে বলে একেবারে পরিপাটি হয়ে বের হচ্ছে দুর্গ থেকে।
- এই মুহূর্তে তার বাবা-মা, ভাইবোন এবং বাকি সব ভ্যাম্পায়াররা দুর্গের মাটির নিচে কফিনে নিদ্রায় সাহিত।
এখন দুর্গে আছে কেবল দাস-দাসী আর প্রহরীরা, যারা সকলেই মানব-মানবী।
অ্যাথানাসিয়া সুউচ্চ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে।
হঠাৎ তার মনে হয় কেউ পেছন দিয়ে সামনে চলে গেলো— আবছা একটা ছায়া দেখতে পায় সে!
চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে, সে অনুভব করে পাশের এক কামরা থেকে শব্দ আসছে।
তা ছিল তার বাবা-মায়ের কামরা— যেটা দিনে কফিনে নিদ্রার সময় কেউই ব্যবহার করে না।
সাহস করে অ্যাথানাসিয়া দরজার সামনে যায়, ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।
আর... চমকে উঠে!
সামনে একজন লম্বা লোক, কালো ওভারকোট পরা।
তিনি প্রহরী, দাস বা সেনাপতি কেউই না।
তার শরীর থেকে এক অচেনা অথচ মোহময়ী গন্ধ ভেসে আসে— এ গন্ধ অ্যাথানাসিয়ার জীবনে প্রথম অনুভব।
লোকটা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, কিছুতেই নড়ছে না।
অ্যাথানাসিয়া তখন দরজার পাশে থাকা তলোয়ার তুলে আক্রমণ করতে যায়!
কিন্তু হঠাৎই সেই লোক অ্যাথানাসিয়ার হাত খপ করে ধরে ফেলে, এক ঝটকায় নিজের কাছে টেনে আনে!
অ্যাথানাসিয়া ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে যায়, ঠিক তখনই...
এক শীতল হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরে।
অন্য হাত তার চোখ ঢেকে দেয়।
আস্তে আস্তে হাত সরিয়ে অ্যাথানাসিয়া চোখ মেলে তাকায়...
সামনেই... ঝুঁকে থাকা এক পুরুষ, যার নিঃশ্বাস পড়ছে তার মুখে।
তার চোখজোড়া — হালকা নীল আর সবুজ মিশ্রিত একোয়া রঙের।অ্যাথানাসিয়া তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে, বাকরুদ্ধ, স্পন্দনহীন।
সে এখনো নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছে লোকটির ওভারকোট।
আর সেই লোক, অ্যাথানাসিয়ার কোমর এখনো ধরে রেখেছে।
লোকটি অ্যাথানাসিয়ার মুখ একদৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করে।
অ্যাথানাসিয়ার দৃষ্টি তখনো আটকে আছে ওই চোখজোড়ায়...
হঠাৎ লোকটি তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়।
কোমর থেকে হাত সরিয়ে নেয়।অ্যাথানাসিয়া কিছুটা হকচকিয়ে যায়, তারপর মুখ শক্ত করে বলে —
"কে আপনি?"
সামনের ব্যাক্তিটি শান্ত গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দেয়,
"জর্জিওস মিয়াউলিস।"
অ্যাথানাসিয়ার চোখ বিস্ফারিত।
ঠোঁটজোড়া কেঁপে ওঠে, বুকের ভিতর ধুকপুকানি শুরু...
দিনের আলোয় যখন অ্যাথানাসিয়ার গোত্রের প্রতিটি ভ্যাম্পায়ার গভীর নিদ্রায় ডুবে থাকে কফিনের অন্ধকারে, ঠিক তখনই প্রাসাদের পাথরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে বিস্ময়ভরে চেয়ে থাকে এক পুরুষের দিকে। জর্জিওস।
এক ভ্যাম্পায়ার, অথচ দিনের আলোয় নির্বিকার ঘুরে বেড়াচ্ছে, সূর্যের স্পর্শে এক বিন্দু ব্যথাও যেন তার গায়ে লাগছে না। অ্যাথানাসিয়ার হৃদয়ে হাজার প্রশ্নের ভিড়, মাথার ভেতর এক বিশাল ঝড়।অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে।
জর্জিওস বাঁকা হেসে বলল,— "নিজের মস্তিষ্ককে অতটা চাপ দিও না, অ্যাথানাসিয়া। ধীরে ধীরে সব জানতে পারবে। আমি সাধারণ কোনও রক্তচোষা নই। আমি একজন মহাশক্তিধর ভ্যাম্পায়ার। আমার রক্তে প্রবাহিত হয় এমন ক্ষমতা, যা আমাদের প্রজাতির কেবল নির্বাচিতদেরই থাকে। দিনের আলোয় আমি বাঁচি, মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে পারি—তাদের মতোই নিঃশ্বাস নিই, হাসি, এমনকি... অনুভব করি।"
জর্জিওসের ঠোঁটে এক প্রশস্ত, রহস্যময় হাসি। অ্যাথানাসিয়া এক মুহূর্তে বিস্ময় ভুলে গিয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,

— "আপনি বাবার কামরায় এই সময় কী করছেন?"
— "প্রহরী বলছিল, তুমি কাল আমার কামরার সামনে এসে ফিরে গিয়েছিলে আমার সঙ্গে দেখা করতে। তাই আমি নিজেই এসেছিলাম আজ তোমার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু তুমি ছিলে না। তখন ভাবলাম, হয়তো বাবার কামরায় এসেছ। তাই সেখানে এলাম।"
— "আমি লোকালয়ে যাচ্ছিলাম," অ্যাথানাসিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলে।
জর্জিওস তার ঠোঁটে বিদ্রুপ এনে বলে,
— "ওহ্, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম—তুমি তো একজন সাধারণ মানবী!" তাচ্ছিল্যের সুর স্পষ্ট।
অ্যাথানাসিয়ার ঠোঁটের কোণে খেলা করে এক চোরা হাসি,
— "হ্যাঁ, আমি মানবী। তবে সাধারণদের মাঝে এক অসাধারণ মানবী আমি।"
এক মুহূর্তের জন্য জর্জিওস থেমে যায়। তার চোখে খেলে যায় এক অচেনা দৃষ্টিভঙ্গি।
— "আজ তাহলে আমি আসি... কিং জর্জ।"
তিক্ত কণ্ঠে বলে অ্যাথানাসিয়া।
সে পা বাড়ায় দরজার দিকে। ঠিক তখনই তার পেছনে ভেসে আসে এক নরম কণ্ঠ—
— "অ্যাথানা।"
সে ঘুরে তাকায়, চোখে বিস্ময়,
— "আমার নাম অ্যাথানাসিয়া।"
— "আমি 'অ্যাথানা' বলেই ডাকব," ধীরে বলে জর্জিওস।
— "কিন্তু কেন?" কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে সে।
কিন্তু জর্জিওস কিছু না বলেই পাশ কাটিয়ে চলে যায়। অ্যাথানাসিয়ার ভিতরে কিছু একটার চিড় ধরে। রাগে অ্যাথানাসিয়া নেমে আসে সিঁড়ি দিয়ে, দরজার কাছে এসে পৌঁছতেই এক কর্কশ কণ্ঠ থামিয়ে দেয় তাকে,
— "দাঁড়াও!"
জর্জিওস সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। তার চোখে ঝলসে ওঠে আদেশের আগুন— "তুমি এখন এক পা-ও বের হবে না এই দুর্গ থেকে। এ আমার আদেশ।"
— "কেন? আমি প্রতিদিনই যাই। আমি কারো আদেশে চলি না।" কণ্ঠে কঠিনতা অ্যাথানাসিয়ার।
— "তুমি জানো না, এই চারদিকে শত্রুদের ছায়া ছড়ানো। হায়েনা আর নেকড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তুমি সাধারণ মানুষ, তোমার পক্ষে একা বের হওয়া নিরাপদ নয়।"
— "আমি আত্মরক্ষা করতে জানি, কিং জর্জ।"
— "আমি এই দুর্গের মহারাজ। এতদিন যা খুশি করেছো, কেউ কিছু বলেনি। এখন আমি এসেছি। আর আমার নির্দেশ মানতে হবে তোমায়।"
— "আমি বাবাকে বলব আপনি আমার স্বাধীনতায় বাধা দিচ্ছেন।"
— "তোমার জীবন রক্ষায় যদি আমাকে বাধা হতে হয়, হবো। আর মহারাজ ডোরাথস খুব খুশি হবেন জেনে যে, তার উরুনচন্ডি কন্যাকে আমি কিছুটা হলেও স্থির করেছি।"
তার ঠোঁটে হাসি—বাঁকা, গর্বিত।
— "তবুও আমি যাব। আমার খোলা হাওয়া দরকার। বন্ধুরা অপেক্ষা করছে।"
— "তুমি যাবে না।" কঠোর আদেশ।
অ্যাথানাসিয়ার সহ্যের সীমা ছুঁয়ে যায়। সে জর্জিওসকে উপেক্ষা করে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু সেই মুহূর্তেই—
জর্জিওস এক ঝটকায়তার হাত ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে।
অ্যাথানাসিয়ার পিঠ ঠেকে মিনারের শীতল পাথরে। জর্জিওসের চোখে আগুন। তার একোয়া চোখজোড়া রক্তাভ হয়ে উঠেছে। তার মুখমণ্ডল রাগে বিকৃত, অধর জোড়া কাঁপছে।
— "তোমার দুঃসাহস দেখে আমি হতবাক। শুধু সৎবোন বলেই বেঁচে গেলে। অন্য কেউ হলে এখনই তাকে শেষ করে দিতাম," ফিসফিস করে বলে সে।
ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে অ্যাথানাসিয়ার। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের গতি দ্বিগুণ।
কিছুক্ষণ পর, জর্জিওস ধীরে ধীরে শান্ত হয়। তার চোখে আর আগুন নেই, হাতের শক্তিও আলগা হয়ে আসে।
— "যাও। কামরায় ফিরে যাও," কণ্ঠে এবার কোনো হিংস্রতা নেই, বরং ক্লান্তি।
অ্যাথানাসিয়া দেরি না করে দ্রুত পায়ে সরে যায়, উঠে আসে নিজের কামরায়। দরজা বন্ধ করেই বিছানায় ধপ করে বসে পড়ে।
রাগে জ্বলছে সে। একটুখানি পরেই সেই রাগ ছড়িয়ে পড়ে বাবার দিকেও। কেন বাবা তাকে মহারাজা বানালেন? আন্দ্রেয়াস, আরজিয়াস, এমিলিয়াস—ওদের কাউকে তো দায়িত্ব দেওয়া যেত!
কিন্তু এখন...এই দুর্গের প্রতিটি ইট জর্জিওসের র*ক্তচক্ষুর মত তাকিয়ে আছে তার দিকে।

চলবে…....নাকি Meherin er Ammu 👪





 

Comments

Popular posts from this blog

অ্যাথানাসিয়া পর্ব ১

#অ্যাথানাসিয়া পর্ব ৩