অ্যাথানাসিয়া পর্ব ১
পর্ব ১
------
এই গল্প সম্পূর্ণ কাল্পনিক।এটি এক ভিন্ন জগতের, যেখানে রক্তের ডাকে জেগে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন ভ্যাম্পায়ার
,আর ভালোবাসা জন্ম নেয় সৎভাই-বোনের মাঝে—যা বাস্তবিক নয়, বরং এক পৌরাণিক ছায়াজগতের প্রেমকথা।যারা কল্পনা, রোমাঞ্চ আর রহস্য ভালোবাসেন,তাদের জন্য এই গল্প হতে চলেছে এক অসাধারণ যাত্রা।প্রস্তুত তো? তাহলে চলুন, ঢুকে পড়ি রক্তলাল রাজ্যের রহস্যে… 

---
“ভালোবাসা... ভালোবাসা আসলে কি???
আকাশের যেমন কোনো প্রান্ত নেই,ভালোবাসারও কি তেমনই কোনো গণ্ডি নেই? রাত্রির আকাশে হাজার তারার মেলায় যেমন একটি তারা একলা জ্বলে থাকে , তেমন করেই ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি হাজার বছরের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে, প্রথম একটুকরো আলো দেখতে পেয়েছিলাম।
"অ্যাথানাসিয়া"— আমার সৎবোন,আমার মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর আগের ঘরের কন্যা সন্তান। এক সাধারণ মানবী তার চোখজোড়া কুয়াশাভেজা শীতের সকালে ঘুমভাঙা পদ্মপাতার মতোই ,যেখানে শিশির টলমল করে কেঁপে উঠে,আর আমার মতো পাপীর বুকেও ঝড় তুলে দেয়।
আমরা নাকি সৎভাই বোন—মেসিডোনিয়ার রাজ্য তো তাই বলে,অথচ তার সাথে না আছে আমার রক্তের বন্ধন আর না আছে মাতৃত্বর কোনো যোগসূত্র। তবে সে আমার সৎবোন যা আমি অস্বীকার করতে পারি না, আর নিজের চাওয়া থেকে পালাতেও পারি না।
আমি জর্জিওস মিয়াউলিস এক শক্তিশালী ভ্যাম্পায়ার যে কিনা হাজার বছর ধরে অন্ধকারে থেকেছে,
পাহাড়,নদী, বন, ঘন জঙ্গল পেরিয়ে, মৃ*ত্যুর ছায়ায় হেঁটে বেড়িয়েছে,কিন্তু অ্যাথানাসিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিলো, যেন বালুকাবেলায় বসে থাকা এক সূর্যাস্ত, যেখানে রক্তিম আলো আমার মতো অন্ধকারপ্রাণের বুকেও শান্তির ছায়া ফেলে দিয়েছিলো।
আমি জানি—এই প্রেম অপরাধ, সমাজের নিয়মে এই টান এক অবৈধ আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু প্রকৃতি তো নিয়ম জানে না, সে তো কেবল তার আপন রূপে বয়ে চলে,
ফুল ফোটায়, পাখিরা গান গায়, নদী বয়ে চলে আপন খেয়ালে।
তাহলে আমি যদি অ্যাথানাসিয়ার দিকে টান অনুভব করি,তাহলে কি আমি প্রকৃতির বিরুদ্ধে কিছু করছি?
নাকি প্রকৃতিই আমার ভিতরে এই আকাঙ্ক্ষা জন্ম দিয়েছে?
আমি জানি না, আমি শুধু জানি, ওর নাম উচ্চারণ করলেই আমার শুষ্ক হৃদয়ে বসন্ত নেমে আসে,
রক্তচোষা হয়েও রক্তের গ*ন্ধ ভুলে আমি প্রেমের ঘ্রাণ পাই, আর সেই মুহূর্তে আমি মানুষ হয়ে উঠি—একজন প্রেমিক, যে তার নিষিদ্ধ ভালোবাসার জন্যে নিজের আত্মাকেও দান করতে প্রস্তুত।”
.
.
.
.
.
গ্রিস—সাল -১৯৪১
বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীনতম দেশ গ্রিস। এর উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা মেসিডোনিয়া— সেখানেই এক সুউচ্চ পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল দুর্গ। এই দুর্গের নিচে রয়েছে এক গুহা, যার গহীনে লুকিয়ে আছে এমন এক অজানা সাম্রাজ্য—যার অস্তিত্ব কেউ কল্পনাও করেনি।
গুহার ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা মেলে এক দীর্ঘ সুড়ঙ্গ পথের। সেই পথ পেরুলেই শুরু হয় এক রহস্যময় রাজ্য—যেখানে বসবাস করে এক অচেনা জাতি। তারা কি মানুষ? নাকি অন্য কোনো রূপ?
মানব জাতির বাইরেও এই পৃথিবীতে রয়েছে অনেক অজানা প্রজাতি। তাদের অস্তিত্ব আজও রহস্যে ঘেরা। এমনই এক জাতি হলো—রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার। মানুষের মতোই চেহারা, কিন্তু তাদের প্রধান খাদ্য—মানুষের রক্ত।
এই অদ্ভুত রাজ্যের অবস্থান মেসিডোনিয়ার পাহাড়ের তলদেশে। আর তার ওপরেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়কর দুর্গ— ফ্যাবভিয়ার দুর্গ একটি পাথর নির্মিত প্রারম্ভিক দুর্গ, যার মধ্যে রয়েছে ১১টি ভবন, ১৬টি মিনার, ১৫টি তোরণ, ৩২টি মাটির দেয়াল এবং ৮৫ ফুট উচ্চতার প্রাচীর। দুর্গের দৈর্ঘ্য ২৮৪ ফুট, প্রস্থ ১৮৭ ফুট।এই দুর্গ এবং রাজ্যের একচ্ছত্র শাসক—রাজা ডোরাথোস ফ্যাবভিয়ার।তার পিতা আলেকজান্দ্রাস ছিলেন এই রাজ্যের প্রথম রক্তপিপাসু সম্রাট।
দিনের বেলায় যিনি ছিলেন মানুষের রাজা, আর রাতের অন্ধকারে হয়ে উঠতেন রক্তচোষাদের সম্রাট।
ডোরাথোসের প্রথম স্ত্রী—এফিমিয়া রিগনী ছিলেন অপরূপা ও গুণবতী। তাদের তিন সন্তান—এক কন্যা ও দুই পুত্র।এই কন্যাটিই আমাদের কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র—অ্যাথানাসিয়া।
অ্যাথানাসিয়া দেখতে অপূর্ব—হরিণ-চোখ, গাঢ় বাদামি চোখের মণি, গোলাপি পাতার মতো ওষ্ঠ, কোমরসমান কালো মেঘের মতো চুল।কিন্তু সে ভিন্ন—কারণ, অ্যাথানাসিয়া মানুষ।হ্যাঁ, ভ্যাম্পায়ার রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া এই মেয়েটি সম্পূর্ণরূপে মানব কন্যা। তার দুই ভাই—আন্দ্রিয়াস ও আরজিরিস, এবং মা—সবাই ভ্যাম্পায়ার জাতির।
ডোরাথোসের দ্বিতীয় স্ত্রী হেলেনারও রয়েছে তিন সন্তান—ইনেসা, ইরিয়া এবং এমিলিয়াস। তারা সবাই দক্ষ ভ্যাম্পায়ার, দক্ষিণ রাজ্যের উত্তরাধিকারী।
অথচ অ্যাথানাসিয়ার জন্ম হয়েছিল এক গির্জায়—মানুষের কোলেই। পিশাচের মধ্যে থেকেও সে যেন এক আলোকবর্তিকা।
দিনের আলোতে যখন সব ভ্যাম্পায়ার কফিনে শুয়ে মৃতপ্রায় হয়ে ঘুমিয়ে থাকে, তখন অ্যাথানাসিয়া দুর্গ থেকে বেরিয়ে পড়ে, ঘুরে বেড়ায় পাহাড়-জঙ্গল, গ্রামের পথ।তার মানুষের বন্ধু আছে, সঙ্গী আছে—একটা কালো ঘোড়া, যার নাম ফিলিপ।
তবে এক ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী বলেছে—
অ্যাথানাসিয়ার ঊনিশ বছর পূর্ণ হলে, এক রক্তচন্দ্রগ্রহণের রাতে তার মানবসত্তা বিলীন হয়ে যাবে, সে হয়ে উঠবে পূর্ণ ভ্যাম্পায়ার।সবে অষ্টাদশে পা দিয়েছে সে।তবুও সে ভালোবাসে তার এই মানুষসত্তাকে।
---
সাল ১৯৪২, উত্তর মেসিডোনিয়া — ফ্যাবভিয়ার দুর্গ
রাতের গভীরে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজা ডোরাথোস। শত শত বছর ধরে মানুষের রক্ত না পানে, তার দেহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভ্যাম্পায়ারদের মৃ*ত্যু নেই, তবে সমাধি আছে। ডোরাথোস জানেন—সময়ের পরিসমাপ্তি তার খুব কাছেই। তিনি সিদ্ধান্ত নেন—এই দুর্গের নতুন রাজার নির্বাচন হবে।
তিনি সেনাপতি ফটিসকে ডেকে বলেন—
“আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে, ফটিস। আগামীকাল আমার সন্তানদের ডেকে আনো, কিন্তু কারো কানে যেন এ খবর না পৌঁছায়।”
পরদিন সন্ধ্যায়, সবাই হাজির দুর্গের প্রাসাদে। সকলের দৃষ্টি সিংহাসনের দিকে।
ডোরাথোসের পুত্ররা চুপচাপ ফিসফিস করছে। কেউ বুঝতে পারছে না, হঠাৎ করে কেনো এই সিদ্ধান্ত? কে হবেন পরবর্তী রাজা?
অ্যাথানাসিয়া অবশ্য নির্বিকার। রাজ্য বা সিংহাসনে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে গা ছাড়া ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে পড়েছে।অবশেষে, সবার দৃষ্টি সিংহদ্বারের দিকে—কার আগমন ঘটবে?
---
দুর্গজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। সবার মুখে উদ্বেগের ছাপ, ভ্রু কুঁচকে আছে প্রহরীদের, রানীর চোখে ছায়া পড়েছে চিন্তার। তবে এ কোলাহলের মাঝেও দাঁড়িয়ে আছে অ্যাথানাসিয়া—নিস্তব্ধ, ভাবলেশহীন, চারপাশের কোলাহল তার জন্য নয়। সে চোখে-মুখে কোনো ভাবের রেখাই নেই। এই দুর্গ, এই রাজ্য, রাজনীতির কুটিলতা—এসব তার অস্তিত্বের বাইরের কিছু। সে চায় না শাসন করতে, চায় না ক্ষমতার ভার বইতে। তার মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও—অনন্তের ডাকে।
কয়েক মুহূর্ত এভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অ্যাথানাসিয়া। ভেতরে ভেতরে বিরক্তি জমে উঠছে তার। কোনো কিছু বলার প্রয়োজন বোধ না করে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে দুর্গের প্রশস্ত ফটক পেরিয়ে। বাগানের সুঘ্রাণময় পথ ধরে হেঁটে চলে আসে দুর্গের পেছনের দিকের ঘন কালো জঙ্গলে।
সেখানে দাঁড়িয়েই সে উচ্চস্বরে ডাকতে থাকে—
“ফিলিপ! ফিলিপ!”
তার কণ্ঠে ছিল তাড়াহুড়ো নয়, ছিল এক চেনা অধিকার। কয়েকবার ডাকার পরেই ছুটে আসে ফিলিপ—কালো টগবগে ঘোড়াটি। দৃষ্টিতে বুদ্ধি, শক্তির দীপ্তি, আর অ্যাথানাসিয়ার প্রতি এক নিঃশব্দ অনুরাগ। এ ঘোড়াই তার একমাত্র সঙ্গী, যাকে একমাত্র বিশ্বাস করে সে। ফিলিপের কানে যেনো সব কথা পৌঁছায়, সব অনুভূতি বুঝে ফেলে সে—মনের সব লুকানো কথা ফিলিপের সাথেই ভাগ করে নেয় অ্যাথানাসিয়া।
সে লাফ দিয়ে উঠে বসে ঘোড়ার পিঠে। লাগাম হাতে নিয়ে টান দিতেই ছুটে চলে ফিলিপ—দ্রুত, উদ্দাম, অবাধ। সন্ধ্যার আবছা আলোয় জঙ্গলের পথে ছুটে চলে এক চঞ্চল তরুণী, বাতাসে ওড়ে তার কোমর ছুঁয়ে থাকা ঘন কেশরাশি—আলগা হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক বাতাসের মতোই স্বাধীন।
এই মুহূর্তে রাজ্য নয়, রাজনীতি নয়, অ্যাথানাসিয়ার জীবন শুধু এই মুক্ত বাতাস, এই নির্জন বন, আর তার প্রিয় সঙ্গী ফিলিপ।
---
দুর্গজুড়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনার তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে। সময় হয়ে এসেছে নতুন রাজার আগমনের। মহারাজ নিজেই সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, চোখে মুখে গর্ব আর প্রত্যাশার আলো। সভাগৃহে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি স্থির প্রধান সদর দরজার দিকে। প্রহরীরা প্রস্তুত, সভাসদেরা নীরব, এক অনিশ্চয়তার প্রতীক্ষায়।
তবে এই উৎসবের আবহে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মহারাজের পুত্রদের মুখে নেই কোনো উচ্ছ্বাস। তাদের চোখে একধরনের অভিমান, ঠোঁটে চাপা ক্ষোভ—তাদের মনে প্রশ্ন, কেনো এই সিংহাসন তাদের কাউকে নয়, বরং অন্য কাউকে দেওয়া হচ্ছে?
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় এসে দাঁড়ায় সেনাপতি। এক ভারী কণ্ঠে ঘোষণা করে:
“নতুন রাজার আগমন হয়েছে।”
সকলের দৃষ্টি সেই দরজার দিকেই আটকে যায়।
প্রবেশ করে একদল সৈন্য, তাদের মাঝে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে এক লম্বা, গম্ভীর পুরুষ। তার গায়ে পায়ে অবধি কালো আলখেল্লা, মাথায় গোল কালো টুপি, এক হাতে ঝুলে থাকা বিশাল তলোয়ার। মুখটা তখনো ছায়ার আড়ালে—রহস্যে মোড়ানো।প্রচণ্ড নীরবতা ভেদ করে সে এগিয়ে আসে সিংহাসনের সামনে, থেমে দাঁড়ায়।তার পাশেই দাঁড়ান মহারাজ। সমস্ত কক্ষে তখনো নিস্তব্ধতা। অবশেষে, মহারাজ ঘোষণা করেন:
“মনোযোগ দিয়ে শোনো সকলে। আজ থেকে এই রাজ্যের নতুন রাজা, আমার পুত্র—‘জর্জিওস মিয়াউলিস’।হয়তো তোমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, এই পুত্র আবার কোথা থেকে এলো? কখনো তো তাকে দেখোনি!
সে আমার দ্বিতীয় স্ত্রী হেলেনার প্রথম স্বামীর সন্তান। হেলেনা আমার জীবনের ভালোবাসা ছিল, আর এসিস মিয়াউলিস ছিল আমার হৃদয়ের বন্ধু—ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বাঁধা।আজ তারই একমাত্র সন্তানকে আমি আমার পুত্র বলে গ্রহণ করেছি। আমার র*ক্তে না হলেও, হৃদয়ে সে আমার নিজের সমান। তোমাদের মতোই আমার সন্তান।
জর্জিওস একজন অসাধারণ শক্তিশালী ভ্যাম্পায়ার, অসম সাহসী এবং বিচক্ষণ। এই দুর্গের সুরক্ষা, এই রাজ্যের স্থিতি—তার হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ।তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রাজ্যের দায়িত্ব আমি জর্জিওসকেই সমর্পণ করলাম। আশা করি, কেউ এই সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তুলবে না।”
তার কথা শেষ হতেই হঠাৎ সভার নিস্তব্ধতা চিরে এক গর্জন করে ওঠে আন্দ্রেয়াস:
“কিন্তু বাবা! সে তো আমাদের সৎ ভাই! কেবল সৎ নয়, তার সাথে আমাদের কোনো রক্তের সম্পর্কও নেই! সে কীভাবে এই সিংহাসনের অধিকার পায়?”
সঙ্গে সঙ্গে মহারাজের চোখ রক্তিম হয়ে ওঠে। এক তীব্র ধমক দিয়ে বলে ওঠেন:
“খামোশ!!”
তার গর্জনে সভার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সকলে শিউরে ওঠে। আন্দ্রেয়াস কেঁপে যায়। মুখ নিচু করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে, তার পিতা যেমন ন্যায়বান, তেমনি রেগে গেলে অসীম ভয়ঙ্কর।
মহলের বাতাস থমথমে।
আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, মাথা নিচু করে থাকা জর্জিওস ধীরে ধীরে মাথা তোলে।তার চোখে আগুন—আত্মবিশ্বাসের, ক্ষমতার, আর এক রহস্যময় অতীতের শিখা।
ইনেসা, ইরিয়া, এমিলিয়াস তিনজনেই একে অপরের মুখের দিকে তাকালো। ইনেসার চোখে তখন ভয়ের ছাপ, ইরিয়া নিঃশব্দে ঠোঁট কামড়ে ধরলো, আর এমিলিয়াস একদৃষ্টিতে রাজসভার মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো—তাদের ভেতরে কোনো গোপন অস্থিরতা বিরাজ করছিলো।
এদিকে দূরে, দুর্গের পেছনের কালো জঙ্গলে, ঘোড়ার পিঠে বসে অ্যাথানাসিয়া দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার ভ্রু কুঁচকে আছে, মনে হচ্ছিলো কিছু টের পাচ্ছে। হাওয়ার ছোঁয়ায় পাতারা ফিসফিস করে উঠলো, ফিলিপ হালকা ফুঁকার শব্দ করলো।
অ্যাথানাসিয়া চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নিয়ে বললো,
“আজ ওদের রাজ্য পেয়ে গেছে এক দেবতা,
আর আমি… আমি এখনো বন্দি আমার নিজের ভেতরে।”
তবে সে জানে না, তার জন্ম, তার রক্ত, তার ভবিষ্যৎ—সবকিছুই জড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে। যে ভবিষ্যদ্বাণী জানে ডোরাথোস, জানে জর্জিওস, এমনকি জানে সেই পুরাতন যোদ্ধারা যারা আজ আর জীবিত নেই।
তবে প্রশ্ন একটাই—
জর্জিওস কি আদৌ এই সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরসূরি?
অ্যাথানাসিয়া কি হবে সেই ভবিষ্যতের মহারানী যাকে নিয়তি বেছে রেখেছে রাজ্য শাসনের জন্য? আর ডোরাথোসের হৃদয়ে যে ভয় লুকিয়ে আছে, সেটার শেষ কোথায়?
.
.
.
.
জর্জিওস সিংহাসনে বসে, মহারাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসেন। তার হাতে সোনালী রাজকীয় মুকুট, যা বিশাল এক ঐতিহ্য এবং সম্মানের প্রতীক। এক মুহূর্তের জন্য সবার দৃষ্টি থেমে যায়, যখন মহারাজ সুরে সুরে জর্জিওসের মাথায় মুকুটটি পরিয়ে দেন। সেই সোনালী মুকুটটি সিংহাসনের চিরকালীন মর্যাদার সাথে তার মাথায় স্থাপিত হয়।সবার হৃদয় গভীর অনুভূতিতে ভরে ওঠে,আর জর্জিওস নিজে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসলো।
সর্বাঙ্গে এক নীরব উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে,মনে হলো সিংহাসনের আসল অধিকারী জর্জিওসই। সব চোখ তার দিকে নিবদ্ধ। তাঁর সৌন্দর্য কোন দেবতার মতো। ডোরাথোসের পরিবারও তাঁর সম্পর্কে অনেক শুনেছিল, তবে কখনো চোখের সামনে দেখতে পায়নি।
জর্জিওসের প্রাক্তন জীবন ছিল এথেন্সের মেসিডোনিয়ার পাহাড়ে, এসিসের দুর্গে। সেখানে তার জীবন কাটিয়েছে, চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে। তবে ডোরাথোস যখন হেলেনাকে বিয়ে করেন, তার কিছুদিনের জন্য সেখানে অবস্থান করেন। এই সময়ে, ডোরাথোস জর্জিওসের বিচক্ষনতা এবং বুদ্ধিমত্তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
যখন এসিস রাজ্য থেকে আক্রমণভীতি নিয়ে মারা যান, তখন তিনি তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর সুরক্ষা এবং ভবিষ্যত জন্য নিজের বন্ধুকে তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা তুলে দেন।
মুকুট পরানোর পর, জর্জিওস মাথা উঁচু করে বসে। তার চোখে এক নতুন শক্তির আলোকিত ঝলক ছিল, যা রাজ্য ও সিংহাসনের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে।
এই মুহূর্তে, একেবারে সবকিছু থেমে গেছে। উপস্থিত সকলের মাঝে গম্ভীর নীরবতা বিরাজ করছে। জর্জিওস তার গভীর, মিষ্টি কণ্ঠে ঘোষণা করে, "আমি আজ থেকে এই রাজ্যের সমস্ত দায়িত্ব আমার উপর নিয়ে নিলাম," জর্জিওস বলল, তার কণ্ঠে কোনো ভয় ছিল না, বরং গম্ভীরতার ছাপ ছিল। "এখানে প্রতিটি জীবের সুরক্ষা এবং রাজ্যের ভবিষ্যত আমার হাতে। ডোরাথোস ফ্যাবভিয়ারের দেওয়া সিংহাসনের মর্যাদা আমি রক্ষা করবো। আমি সকলকে কথা দিচ্ছি আমাদের রাজ্য শক্তিশালী হবে, যেমনটি আগে কখনো ছিল না।"
সবার মনোযোগ ছিল জর্জিওসের প্রতি। তাঁর সৌন্দর্য এক গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর সমতুল্য। তাঁর একোয়া রঙের চোখ সমুদ্রের গভীরতা ধারণ করেছে। সোনালী সিল্কি চুল বাতাসে উড়ে চলেছে, আর তার সুঠাম দেহে এক শক্তির পরিচয় ছিল।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যকর ছিল তার চেহারায় থাকা গাম্ভীর্য। এমন সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও, তার মুখে কোনো হাসি ছিল না। বরং, এক রাজকীয় শৃঙ্খলার পরিচয় ছিল।
সকলেই মাথা ঝুঁকে সম্মান জানাতে থাকে, তবে কিছু কিছু চোখে অস্বস্তি ছিল। আন্দ্রিয়াস এবং আরজিরিসের মধ্যে চুপচাপ কিছুটা অস্বস্তি ছিল, তবে তারা মুখে কিছু না বললেও তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব স্পষ্ট ছিল। তারা কীভাবে তাদের সৎ ভাইয়ের শাসন মেনে নেবে, তা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করছিল।
এদিকে, জর্জিওসের বোন ইনেসা, ইরিয়া এবং ভাই এমিলিয়াস,বেশ খুশি হয়ে উঠেছিল।আর সবচেয়ে বেশি খুঁশি যে ছিলো তা হলো জর্জিওসের মা হেলেনা। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই নতুন রাজা তাদের রাজ্য এবং পরিবারকে নিরাপত্তা দেবে, তবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখনকার মতো কঠিন হতে চলেছে।
এখন, রাজ্যের নতুন শাসক হিসেবে, জর্জিওসের সামনে ছিল বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সবচেয়ে প্রথমে তাকে রাজ্যের শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে, যারা সুযোগ পেলে রাজ্যের দুর্বলতা দেখতে পাবে। তার জন্য শক্তিশালী মিত্র তৈরির প্রয়োজন। তবে এই মুহূর্তে, তার চোখের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল — আন্দ্রিয়াস ও আরজিরিসকে রাজ্যের সমৃদ্ধিতে যুক্ত করা, তাদের আত্মসম্মান রক্ষা করে তাদেরও রাজ্যের অংশীদার করে তোলা।
একদিকে, শত্রুদের ষড়যন্ত্র ছিলই, অন্যদিকে, তার পিতার প্রভাব মুছে ফেলতেও জর্জিওসকে শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। অথচ, তার মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—‘আসলে, আমি কি এই রাজ্যকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবো?’
এই চিন্তাগুলোর মাঝে, জর্জিওসের সামনে যে কোনও মুহূর্তে বিপদ আসতে পারে, এটা সে জানতো। তার উপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছিল।
---
ডোরাথোস সিংহাসনের একপাশে দাঁড়িয়ে চারদিকটা একবার ভালো করে দেখে নিলেন। চোখ কাউকে খুঁজছিল। কিন্তু উপস্থিত ভিড়ের মাঝে কোথাও অ্যাথানাসিয়াকে দেখা গেল না। রাজা ডোরাথোসের গম্ভীর মুখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এলো। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ধাবিত হলো সিংহাসনের ধাতব মেঝের দিকে। মনে মনে হয়তো নিজের কন্যার অবস্থান ঠিক বুঝে গেছেন।
সবার মাঝে একটি প্রশ্নবোধক বাতাস ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন সময় তিনি পুনরায় সম্মুখে দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
— “সকলেই মনযোগ দাও। আমার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ রয়েছে, যা আজ তোমাদের জানানো প্রয়োজন।”
তার গলার সুর ছিল ভারী, প্রতিটি শব্দ দুর্গের প্রাচীর ভেদ করে দূরে কোথাও প্রতিধ্বনি তুলছিল।
— “আমার বাবা, প্রয়াত মহারাজ আলেকজান্দ্রাস ফ্যাবভিয়ার, যাঁর হাত ধরেই এই দুর্গের ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল, তিনি আমাকে বলেছিলেন— আমার পরবর্তী উত্তরসূরী আর কোনো রাজা হবেন না। কারণ ভাগ্যের পরিক্রমায় নির্ধারিত হয়েছে, এই দুর্গ একদিন শাসন করবেন একজন রানী।
হ্যাঁ, আমি আজ ঘোষণা করছি, এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ শাসক হবেন আমার একমাত্র কন্যা অ্যাথানাসিয়া ফ্যাবভিয়ার।
তবে তার ঊনিশতম জন্মদিন পেরোলেই সে ফিরে পাবে তার প্রকৃত রূপ— পূর্ণাঙ্গ অলৌকিক শক্তির রূপ, যা তাকে অসীম শক্তির অধিকারী করে তুলবে।”
এক মুহূর্তে মহলে নীরবতা নেমে এলো। কেউই নিশ্বাস নিতেও সাহস পাচ্ছে না।
ডোরাথোস এক ফোঁটা দৃষ্টিভঙ্গি না বদলে সামনের দিকে চেয়ে বললেন, — “আমি চেয়েছিলাম, আমার রাজত্বের উত্তরাধিকারি হোক আমার কন্যা। কিন্তু হঠাৎ শরীর ভেঙে পড়ায় এবং তার অনভিজ্ঞতার কারণে আমি একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
যতদিন না অ্যাথানাসিয়া নিজেকে একজন যোগ্য রানী হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে, ততদিন পর্যন্ত আমার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকবে আমার পুত্র, জর্জিওস ফ্যাবভিয়ার।” এই ঘোষণার পর উপস্থিত সকল প্রজারা মাথা নত করে সম্মতি জানালেও, কিছু মুখে দেখা গেলো অন্যমনস্কতা।
ইনেসা, ইরিয়া, এমিলিয়াস এবং হেলেনার চোখে একপ্রকার স্তম্ভিত বিস্ময় ছায়া ফেলল। তাদের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তে পাল্টে গেল, এমন ঘোষণার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না তারা। হেলেনার ঠোঁট কাঁপছিল, ইনেসার চোখে ক্ষণিকের জন্য একরাশ সন্দেহ।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আন্দ্রেয়াস ও আরজিয়াস— একদম নিরুত্তাপ। তারা খুশি না বিরক্ত, সেটা বোঝার উপায় ছিল না। তাদের মুখ মোমের মত জমে থাকা এক মুখোশের ন্যায়।
আর সিংহাসনের সামনে বসে থাকা জর্জিওস— নিঃশব্দ, অথচ মাথা তুলে দৃঢ় দৃষ্টিতে পিতার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তার ঠোঁটের কোণে কোনো গর্বের চিহ্ন নেই, আছে কেবল এক নিঃসীম দায়িত্বের ছায়া।
.
.
.
.
সন্ধার নরম বাতাসে ভেসে আসছিল বাগানের ফুলের মিষ্টি গন্ধ। অ্যাথানাসিয়া ঘোড়ার সফর শেষে নীরবে এসে দাঁড়ায় প্রাসাদের পশ্চিম পাশে ছোট্ট বাগানটিতে, যেখানে তার শৈশবের স্পর্শ এখনো জেগে আছে প্রতিটি পাতায়। ঘোড়ার লাগাম ঢিলে করে সে তাকে নির্দিষ্ট জায়গায় বেঁধে রাখে, তারপর এক হাতে লন্ঠন তুলে নেয়, অন্য হাতে গাউন সামলে ধীরে ধীরে বাগানের দিকে এগিয়ে যায়।
এই বাগানটা তার নিজের হাতে গড়া— প্রতিটি গাছ, প্রতিটি চারায় তার ভালবাসা মিশে আছে। তার রোপণ করা নার্গিস ফুলের গাছগুলো এখন সেজেছে মেয়ের সাজে। সাদা-হলুদ রঙের নার্গিস তার প্রিয়। এই ফুলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাস, দেবতা নার্সিসাসের কাহিনি— সৌন্দর্যের জন্য অভিশপ্ত এক আত্মা। ঠিক যেমন তার নিজের জীবনও অভিশাপঘেরা।
অ্যাথানাসিয়া আনমনে হাত ছুঁয়ে দিচ্ছিল প্রতিটি ফুলকে, একটাকে আদরে আলতো করে কোলে টেনে নিচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো এক কোমল কণ্ঠ— “প্রিন্সেস?”
সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ায়। মুখে বিরক্তি না থাকলেও চোখে এক ধরনের অভ্যস্ত ক্লান্তি খেলে গেল।
“ওহ্ ডেনা… তোমাকে কতবার বলেছি, আমাকে নাম ধরে ডাকো। তুমি তো আমার একমাত্র সখি, কখনও তোমাকে দাসীর চোখে দেখিনি।”
ডেনা তার দিকে এগিয়ে আসে, চোখে একরাশ স্নেহের দীপ্তি। “কিন্তু প্রিন্সেস, আমি তোমাকে ভালোবেসে প্রিন্সেস বলি। তোমাকে দেখলেই মনে হয়, গ্রীক দেবী এথেনার কোনো অংশ।”
অ্যাথানাসিয়া হালকা হেসে মাথা নাড়ায়। “ডেনা, পিশাচের ঘরে জন্ম যার, যার ভবিষ্যত নির্ধারিত এক পিশাচীনিতে রূপান্তর হওয়ার— তাকে তুমি দেবী এথেনার সঙ্গে তুলনা করো?”
ডেনা মৃদু হেসে আরও কাছে এসে গায়ে হাত রাখে তার।“তবু আমার চোখে তুমি সেই একই রকম। বলো, কোথায় ছিলে তুমি? নতুন রাজা আগমন করেছেন, আর তুমি তার দর্শন নিলে না? সে তো তোমার ভাই— আমাদের নতুন মহারাজ জর্জিওস!”
অ্যাথানাসিয়া একটা নার্গিস ফুল ছিঁড়ে নিয়ে কানের পাশে গুঁজে দেয়, লালচে কেশে অদ্ভুত এক ছায়া খেলে যায় চাঁদের আলোয়।
“তুমি তো জানো ডেনা, রাজনীতি আর সিংহাসনের চকচকে মুখোশে আমার আগ্রহ নেই। আমার মন পড়ে থাকে এখানেই, এই মাটির কাছাকাছি।”
ডেনা একটুখানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“তবু না দেখে ভুল করছো প্রিন্সেস… আমি চোখে দেখেছি তাকে— মনে হলো গ্রীক দেবতা অ্যাপোলোরই কোনো অংশ! এত সৌন্দর্য, এত ঐশ্বর্য! আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। কেউ তাকালে হয়তো আর চোখ ফেরাতে পারবে না…”
অ্যাথানাসিয়া এবার মৃদু হাসে। তার ঠোঁটের কোণে খেলে যায় এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক কোমলতা।
“সৌন্দর্যের মোহে মুগ্ধ হয়ে মূর্ছা যাওয়ার মতো মেয়ে আমি নই, ডেনা। তুমি তো জানো।”
বাগানের নিঃস্তব্ধতায় লন্ঠনের আলো আর দুজন নারীর আলাপ এক অব্যক্ত গল্প বুনে চলে,যেটা হয়তো ভবিষ্যতের বুকে জমে আছে অনেক বিস্ময় ও বেদনার জন্য।
---
ফ্যাবভিয়ার ক্যাসল.....
রানি হেলেনার ব্যক্তিগত কক্ষে দেয়ালের উপর ভিক্টোরিয়ান চিত্রশৈলীর ছায়া নাচছিল। জানালার ওপাশে ঘন মেঘে ঢাকা সন্ধ্যা।রাজপ্রাসাদের এক কোণার ঘরে জমে উঠেছে ক্রমাগত চাপা অসন্তোষ।
“মা… তার মানে ভাই রাজা হয়েছে কেবল সাময়িকভাবে?”— কর্কশ ও তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো এমিলিয়াস।তার চোখে রাগের ঝিলিক, মুখে কুঞ্চিত ভ্রু। “আর দুই বছর পরে সেই আমাদের সৎবোন অ্যাথানাসিয়া হবে রানী?”
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ইনেসা গর্জে উঠলো, “কিন্তু কেনো? কেনো কোনো রানি যদি এই রাজ্য শাসন করবেই, তাহলে সেটা আমি অথবা ইরায়া নয় কেনো? কেনো সেই ‘মানুষ’ মেয়েটি?”
হেলেনা ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। চোখে অন্যমনস্ক ভাব, তবু ঠোঁটে এক সুস্পষ্ট বিরক্তির রেখা।
“আমি নিজেও তা ভাবছি। তবে এসব নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করে কী লাভ? যেটা হওয়ার, সেটা হবেই। এখন তোমাদের ভাই এসেছে, তাকেই কাজ করতে দাও। রাজনীতি একা একা শেখানো যায় না, সেটি করতে হয়...”
এই বলে রাজকীয় ভঙ্গিতে কামড়া ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন রানি হেলেনা।
তার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর হঠাৎ ইনেসা দাঁত চেপে বলল, “ওই মেয়েটা সবদিক থেকে কেনো এগিয়ে, বলো তো? রূপে, গুণে, ক্ষমতায়— এমনকি ভবিষ্যতের ভাগ্যেও! একটা সাধারণ মানবি, আমাদের চেয়ে কী করে এত বেশি হতে পারে?”
ইরিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে, গলা নামিয়ে বলল,
“কারণ সে মানুষ বলেই... তার মধ্যে এক স্বাভাবিক সৌন্দর্য আছে, যা আমাদের নেই। মানুষের রক্তে যেমন কোমলতা, তেমনি অভিশাপও আছে... কিন্তু তাকেই ভাগ্য নির্বাচিত করেছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করতে পারি।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ভেতরে চাপা বিদ্বেষ, দম্ভ আর অদৃশ্য আতঙ্ক মিলেমিশে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের পূর্বাভাস ছুঁয়ে যায়।
.
.
.
.
.
ধীর পায়ে আপন মনে হেঁটে চলেছে অ্যাথানাসিয়া। রাজপ্রাসাদের দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে সে এগিয়ে চলেছে নিজের কামরার দিকে। সন্ধ্যার ঝিম ধরা আলোয় কাচে প্রতিফলিত হচ্ছিল তার মুখ।
ঠিক তখনই— “অ্যাথানাসিয়া! গম্ভীর, দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
পা থেমে যায় মেয়েটির। চোখে বিন্দুমাত্র বিস্ময় নেই, সে জানত এই ডাক আসবেই। ডানদিকে ঘুরে শান্ত ভঙ্গিতে প্রবেশ করে ডোরাথোসের কামরায়।
“জি, বাবা?”
ডোরাথোস বসে ছিলেন রাজকীয় কুর্সিতে, চারপাশে ছড়ানো মোমবাতির আলোয় তার চোখ জ্বলজ্বল করছে।
“ভরা মজলিস ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”
স্বরে কোনো রাগ নেই, কিন্তু গাম্ভীর্যে দেয়ালগুলোও কেঁপে ওঠে।
“আমি ফিলিপকে নিয়ে জঙ্গলে গিয়েছিলাম, বাবা।”
শান্ত, কিন্তু আত্মবিশ্বাসহীন কণ্ঠে উত্তর দেয় অ্যাথানাসিয়া।
“জঙ্গলে?” ডোরাথোস এবার একটু উঠে দাঁড়ান।
“বিশেষ একটি মুহূর্তে, রাজ্য পরিচালনার আলোচনা চলছিল। তুমি কীভাবে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হতে পারো? তুমি এখনো ভাবো তুমি শিশু? ভবিষ্যতের রানি তুমি—তোমাকে এখন থেকেই শিখতে হবে, অংশ নিতে হবে প্রতিটি কার্যক্রমে।”
অ্যাথানাসিয়ার মাথা নিচু। কিন্তু ঠোঁট দুটো শক্তভাবে চেপে ধরা। “কিন্তু বাবা… আমার কাছে এসব জিনিস বিরক্তিকর মনে হয়। সত্যি বলতে আগ্রহ জাগে না।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। ডোরাথোসের চোখে ভেসে ওঠে দুঃখ আর প্রত্যাশার ধাক্কা। “একদিন এই দুর্গ, এই রাজ্য—সবকিছু তোমার হবে, অ্যাথানাসিয়া। রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে একে রক্ষা করবে কে?”
একটু থেমে আবার বলেন “তোমার ভাই, নতুন মহারাজ জর্জিওসের সঙ্গে দেখা করেছো?”
“না বাবা। আমি কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছি। খুব ক্লান্ত লাগছে। বিশ্রাম নিই, তারপর মাঝরাতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করব।” ডোরাথোস কেবল মাথা হেলান, ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, “ঠিক আছে, যাও।”
তিনি ফিরে যান নিজের শয্যার দিকে।
অ্যাথানাসিয়া ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে কামরা থেকে। তার চোখে কোনো ভয় নেই, কিন্তু কোথাও এক দুঃসহ ভার ঝুলে আছে।
চলবে…............

Comments
Post a Comment